গাজা যুদ্ধ নিয়ে নির্মিত পুরস্কারজয়ী তথ্যচিত্রের দুই ইসরায়েলি নির্মাতার নাগরিকত্ব বাতিলের হুমকি দিয়েছেন দেশটির সংস্কৃতিমন্ত্রী মিকি জোহার। চলচ্চিত্র নির্মাতা ইউভাল আব্রাহাম ও র্যাচেল জোরের বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার’ অভিযোগ তুলেছেন তিনি।
‘নাজা’ নামের তথ্যচিত্রটিতে গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় বিপুলসংখ্যক বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। নির্মাতাদের দাবি, এসব মৃত্যু কেবল যুদ্ধের অনিচ্ছাকৃত ফল নয়; বরং হামলার লক্ষ্য নির্ধারণ ও সামরিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবেও বেসামরিক হতাহতের ঝুঁকি নেওয়া হয়েছে।
ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে তথ্যচিত্রটি বিশেষ জুরি পুরস্কার পাওয়ার এক দিন পর ইসরায়েলে এ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে মিকি জোহার দুই নির্মাতার সমালোচনা করে বলেন, রাষ্ট্রের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে তাদের নাগরিকত্ব বাতিলের জন্য তিনি দ্রুত পদক্ষেপ নেবেন।
ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরও দুই নির্মাতার সমালোচনা করেছেন। তিনি তাদের ইসরায়েলি জনগণের জন্য ‘লজ্জা ও অপমান’ বলে মন্তব্য করেন এবং দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার আহ্বান জানান।
‘নাজা’ তথ্যচিত্রটি প্রযোজনা করেছে যুক্তরাজ্যের সংবাদপত্র দ্য গার্ডিয়ান। ৮০ মিনিটের এই তথ্যচিত্রে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার ২৪ জন সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। নির্মাতাদের দাবি, এসব কর্মকর্তা গাজা যুদ্ধে ব্যবহৃত বিভিন্ন সামরিক ব্যবস্থা পরিচালনা বা পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
তথ্যচিত্রে ইসরায়েলের হামলার লক্ষ্য নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার ব্যবহারের বিষয়ও তুলে ধরা হয়েছে। সাক্ষাৎকার দেওয়া এক ব্যক্তি দাবি করেন, হামাসের একজন সদস্যকে হত্যার জন্য এমন একটি হামলার অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, যাতে ৫০০ বেসামরিক মানুষ নিহত হওয়ার আশঙ্কা ছিল।
তবে তথ্যচিত্রের এসব অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী। তাদের দাবি, সাক্ষাৎকার দেওয়া ব্যক্তিরা সত্যিই সামরিক বাহিনীতে কাজ করেছেন কি না, তারা কী পদে ছিলেন এবং উল্লেখ করা সামরিক অভিযানের সঙ্গে তাদের সরাসরি সম্পর্ক ছিল কি না—এসব বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ইসরায়েলি বাহিনী আরও বলেছে, হামলার লক্ষ্য নির্ধারণ ও অনুমোদনের সিদ্ধান্ত মানুষই নেন এবং এসব সিদ্ধান্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হাতে দেওয়া হয় না। তাদের দাবি, সামরিক অভিযান আন্তর্জাতিক আইন মেনে পরিচালিত হয় এবং বেসামরিক মানুষের ক্ষতি কমাতে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে।
ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শনের পর তথ্যচিত্রটি দর্শকদের ব্যাপক সাড়া পায় এবং প্রায় ২৫ মিনিট ধরে দর্শকরা দাঁড়িয়ে নির্মাতাদের অভিনন্দন জানান। পরে এটি বিশেষ জুরি পুরস্কার লাভ করে। ইউভাল আব্রাহাম ও র্যাচেল জোর এর আগে ‘নো আদার ল্যান্ড’ তথ্যচিত্রের জন্য ২০২৫ সালে অস্কার জিতেছিলেন।
ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্টের ২০২২ সালের এক রায়ে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে নাগরিকত্ব বাতিলের সুযোগের কথা বলা হয়। পরের বছর সন্ত্রাসবাদের মতো গুরুতর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও এ সুযোগ বাড়ানো হয়। তবে আব্রাহাম ও জোরের বিরুদ্ধে নাগরিকত্ব বাতিলের প্রক্রিয়া কীভাবে এগোবে, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
তুলি আক্তার/ ডেস্ক বিপিসি