বরিশালের হিজলা উপজেলায় কোটি টাকা ব্যয়ে নবনির্মিত ‘মৌলভীরহাট লঞ্চঘাট’ উদ্বোধনের কয়েক দিন যেতে না যেতেই ধসে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের রাজনৈতিক সিন্ডিকেট ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চরম অনিয়ম, দুর্নীতি এবং নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের কারণে এই জনগুরুত্বপূর্ণ ঘাটটির এমন করুণ দশা হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এমনকি গত ৩০ জানুয়ারি (২০২৬) অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নৌপরিবহন এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মাননীয় উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) ড. এম শাখাওয়াত হোসেন কর্তৃক ঘাটটির শুভ উদ্বোধনের পর নতুন বরাদ্দের সংস্কার কাজও শেষ রক্ষা করতে পারেনি। তড়িঘড়ি করে করা জোড়াতালির কাজ আবারও ভেঙে নদীতে চলে যাওয়ায় ক্ষোভে ফুঁসছে এলাকার সাধারণ মানুষ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে, প্রশাসনিক ফাঁকফোকর গলিয়ে এই ঘাটটির মোটা অঙ্কের বাজেট পাস করানো হয়। তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান মরহুম বেলায়েত হোসেন ঢালী ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে এই ঘাট নির্মাণের মূল কার্যাদেশ পাইয়ে দেন তার ছেলে রাজু ঢালীকে।
অভিযোগ রয়েছে, শুরু থেকেই রাজু ঢালী ও তার সিন্ডিকেট ঘাটের কাজে চরম অনিয়ম ও নামমাত্র সামগ্রী ব্যবহার করেন। ফলে কাজ শেষ হওয়ার অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই পুরো ঘাটটি ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। প্রথম দফাতেই সরকারের কোটি কোটি টাকা এভাবে সরাসরি পানিতে ভেসে যায়।
প্রথমবার ঘাটটি ধসে যাওয়ার পর জনগণের চরম দুর্ভোগ ও নদী পারাপারের গুরুত্ব বিবেচনা করে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) ড. এম শাখাওয়াত হোসেনের বিশেষ সহযোগিতায় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ঘাটটির জন্য পুনরায় নতুন বরাদ্দ দেয়।
গত ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ (১৬ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ) ড. এম শাখাওয়াত হোসেন স্বশরীরে উপস্থিত হয়ে এই ‘মৌলভীরহাট লঞ্চঘাট’-এর শুভ উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনের পর নতুন বরাদ্দের কাজ শুরু হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পূর্বের মতোই চরম গাফিলতি ও দায়সারা কাজ করে। ফলে উদ্বোধনের কয়েক দিন পার হতে না হতেই দ্বিতীয় দফার পুরো কাজও এখন ভেঙে নদীগর্ভে বিলীন।
সরেজমিনে ঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, হাজারো মানুষের যাতায়াতের একমাত্র ভরসা এই ঘাটটির সিংহভাগ এখন পানির নিচে। স্থানীয় বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আগে চেয়ারম্যানের পোলা রাজু ঢালী লুটপাট কইরা ঘাট ভাঙলো। পরে নতুন বরাদ্দ আইলো, বড় স্যার (উপদেষ্টা) উদ্বোধন কইরা গেলেন। ভাবলাম এবার হয়তো ভালো কাজ হইবো। কিন্তু এরা কেমন ঠিকাদার আর কেমন ইঞ্জিনিয়ার? কয়েকটা দিনও কাজ টিকাইতে পারলো না! সব টাকা নদী খায়া নিলো। আরেক ভুক্তভোগী বলেন, “সরকারি টাকা এভাবে বারবার লুটপাট হবে আর আমরা সাধারণ মানুষ নদীতে পইড়া মরবো, এটা মেনে নেওয়া যায় না। এই ঠিকাদারের লাইসেন্স বাতিল করা উচিত।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নতুন উপদেষ্টা কর্তৃক উদ্বোধনের পরও কেন কাজের মান এমন নিম্নমানের হলো এবং কোন অদৃশ্য শক্তির জোরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এই দুর্নীতির সাহস পেল, তা নিয়ে এলাকায় নানা প্রশ্ন উঠেছে।
এলাকাবাসীর দাবি, আওয়ামী লীগ আমলের সুবিধাভোগী ঠিকাদার রাজু ঢালীসহ দ্বিতীয় দফায় ঘাট সংস্কারের সাথে জড়িত দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলী ও ঠিকাদারদের অবিলম্বে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হোক। একই সাথে সরকারি অর্থ অপচয়ের তীব্র নিন্দা জানিয়ে পুরো ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের জোর দাবি জানিয়েছেন হিজলার সর্বস্তরের জনগণ।
Leave a Reply