বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬, ০২:৫২ পূর্বাহ্ন

মার্কিন চুক্তিতে আমদানি বেড়েছে দ্বিগুণ

অনলাইন ডেস্ক । বিপিসি বাংলা
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১০ মে, ২০২৬
  • ৩ বার

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের আমদানি খাতে। দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর লক্ষ্য সামনে রেখে চলতি বছরের প্রথম চার মাসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের আমদানি আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। তবে একই সময়ে রপ্তানিতে সেই তুলনায় খুব সামান্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের আমদানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ১০৪ কোটি টাকায়। আগের বছর একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ৯ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আমদানি বেড়েছে ১০১ শতাংশ। অন্যদিকে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি মাত্র ৩ দশমিক ৩২ শতাংশ বেড়ে ৩৫ হাজার ৪৬২ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

এই আমদানির বড় অংশ করেছে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। মোট আমদানির প্রায় ৩৮ শতাংশই এসেছে পেট্রোবাংলা, খাদ্য অধিদপ্তর এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মাধ্যমে। বিশেষ করে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্য আমদানিতে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে।

বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভের দপ্তরের সঙ্গে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনার সময় অন্তর্বর্তী সরকার যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তারই প্রতিফলন এখন দেখা যাচ্ছে। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি শুরু হওয়া আলোচনা জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে, অর্থাৎ ৯ ফেব্রুয়ারি চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে শেষ হয়।

এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, চার মাসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি ব্যয়ের ৮৩ শতাংশ মাত্র ১০টি পণ্যের পেছনে ব্যয় হয়েছে। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে এলএনজি, এলপিজি, সয়াবিন, গম, তুলা, লোহা ও ইস্পাতের স্ক্র্যাপ, সয়াবিন অয়েলকেক ও মিল, বিমানের ইঞ্জিন, ব্রিউয়িং বর্জ্য এবং তরলীকৃত প্রোপেন।

সবচেয়ে বেশি আমদানি হয়েছে এলএনজি। পেট্রোবাংলা এ খাতে ব্যয় করেছে ৪ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে এলপিজি, যার আমদানি মূল্য ৩ হাজার ১০৫ কোটি টাকা। ওমেরা পেট্রোলিয়াম, সান গ্যাস ও ইউনাইটেড আইগ্যাস এলপিজি এই আমদানিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, আগের বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে কোনো এলএনজি বা এলপিজি আমদানি করা হয়নি।

গম আমদানিতেও একই চিত্র দেখা গেছে। আগের বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম কেনা না হলেও চলতি বছরের চার মাসে ১ হাজার ৭৯৭ কোটি টাকার গম আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে খাদ্য অধিদপ্তরের অংশই ১ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা। একই সঙ্গে পোশাকশিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন তুলার আমদানি বেড়েছে ৪৪ দশমিক ৬ শতাংশ। বিমানের ইঞ্জিন আমদানিও কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

তবে এই চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। গত ২০ ফেব্রুয়ারি মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প প্রশাসনের পারস্পরিক শুল্কনীতি বাতিল করে দেয়। পরে মালয়েশিয়াও একই ধরনের চুক্তিকে অকার্যকর ঘোষণা করে। এরপর যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে শুল্ক আরোপ ও বাড়ানোর পথে হাঁটে। যদিও নিউ ইয়র্কের একটি বিশেষায়িত ফেডারেল আদালত পরে জানায়, এমন আইন কার্যকর করতে হলে বড় ধরনের বৈদেশিক মুদ্রা ঘাটতির প্রমাণ থাকতে হবে।

চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ প্রায় ৪ হাজার ৫০০ মার্কিন পণ্যের শুল্ক মওকুফ করেছে। আরও ২ হাজার ২১০টি পণ্যের শুল্ক ধাপে ধাপে কমানো হবে। এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি কিছু পণ্যের ওপর শুল্ক প্রত্যাহার করেছে। তবে গড়ে ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ এমএফএন শুল্ক বহাল থাকছে। পাশাপাশি বাংলাদেশি রপ্তানির ওপর পারস্পরিক শুল্ক কমিয়ে ১৯ শতাংশে নামানো হয়েছে। এর আগে গত বছরের এপ্রিলে বাংলাদেশের ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটা সংরক্ষিত হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম মনে করেন, জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগে এমন একটি চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ায় উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তার মতে, এখন পর্যন্ত যেসব তথ্য সামনে এসেছে, তাতে বাংলাদেশের লাভ সীমিত হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সুবিধা অনেক বেশি।

তিনি আরও বলেন, চুক্তিতে কৃষিপণ্য, জ্বালানি ও শিল্প কাঁচামালে ন্যূনতম বার্ষিক আমদানির বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। ফলে দেশের চাহিদা কম থাকলেও নির্দিষ্ট পণ্য আমদানি করতে হতে পারে, যা দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।

পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী মাসরুর রিয়াজ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তার রপ্তানি বাড়াতে উচ্চ শুল্ককে চাপ প্রয়োগের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেছে। যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার, তাই ওয়াশিংটনকে আশ্বস্ত করতে বাংলাদেশকে নানা প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে। তিনি বলেন, আমদানি হওয়া অধিকাংশ পণ্যই অত্যাবশ্যকীয় এবং আগে অন্য দেশ থেকে কেনা হলেও এখন সেগুলো যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা হচ্ছে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category