ইউটিউবে দেখা একটি ভিডিও থেকেই শুরু। শখের বশে পরীক্ষামূলক চাষ, এরপর একের পর এক পরীক্ষা-নিরীক্ষা। ফলন ও বাজারে চাহিদা ভালো পাওয়ায় সেই শখই পরিণত হয়েছে বাণিজ্যিক উদ্যোগে। এখন ধান কাটার পর পড়ে থাকা জমিতে মাচায় ঝুলছে সারি সারি হলুদ তরমুজ।
মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার গোয়ালবাড়ী ইউনিয়নের ডোমাবাড়ি গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা খোর্শেদ আলমের উদ্যোগে বদলে গেছে পতিত জমির চিত্র। ইচ্ছা, সাহস ও পরিশ্রমে অনাবাদি জমিকে আয়ের উৎসে পরিণত করেছেন তিনি।
উদ্যোক্তা সূত্রে জানা গেছে, পরিবেশ ও সংবাদকর্মী খোর্শেদ আলম প্রায় পাঁচ বছর আগে ইউটিউবে হলুদ তরমুজ চাষের একটি ভিডিও দেখেন। ভিন্নধর্মী এই ফল চাষে আগ্রহ তৈরি হলে ২০২২ সালে মাত্র ছয় শতাংশ জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে চাষ শুরু করেন।
প্রথমদিকে পারিবারিক চাহিদা মেটানোই ছিল তার উদ্দেশ্য। কিন্তু ফলন ভালো হওয়া এবং বাজারে চাহিদা দেখে বাণিজ্যিকভাবে চাষের পরিকল্পনা করেন তিনি।
খোর্শেদ আলম বলেন, ‘ইউটিউবে হলুদ তরমুজ চাষ দেখে শখ জাগে। ভাবলাম, একবার পরীক্ষা করে দেখি। ছয় শতাংশ জমিতে বীজ বপন করলাম। ফলন ভালো হওয়ার পর দেখলাম এর চাহিদাও বেশ। তখন থেকেই বাণিজ্যিকভাবে চাষের চিন্তা করি।’
এবার নিজের প্রায় তিন বিঘা পতিত জমিতে ল্যানফে, সূর্যডিম, সানগোল্ড, লিয়োনা, রবি, সাম্মাম মার্লিন ও হ্যানিডিউ মেলন জাতের হলুদ তরমুজ চাষ করেছেন খোর্শেদ।
গত বছরের ১৮ নভেম্বর সিলেট অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, জুড়ীর সহযোগিতায় ডোমাবাড়ি কচুরগুল ব্লকের ৩৩ শতাংশ জমিতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাণিজ্যিকভাবে চাষ শুরু করেন তিনি।
সরেজমিনে ডোমাবাড়ি গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, জমিতে তৈরি করা হয়েছে প্রশস্ত মাচা। সবুজ পাতার ফাঁকে সারি সারি ঝুলছে হলুদ তরমুজ। মাটির ওপর ছড়িয়ে থাকা লতাগুল্মের মাঝেও দেখা মিলছে বাহারি রঙের ফলের। বাগান দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন উৎসুক মানুষ।
কেউ ছবি তুলছেন, কেউ পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসছেন, আবার কেউ কিনে নিয়ে যাচ্ছেন ১০ থেকে ১৫টি করে। অনেকের কাছেই হলুদ তরমুজ দেখা ও খাওয়ার অভিজ্ঞতা এবারই প্রথম।
কমলগঞ্জ থেকে বাগান দেখতে আসা এম এ ওয়াহিদ রুলু বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাগানের ছবি দেখে লোভ সামলাতে পারিনি। এত দূর থেকে এসেছি উদ্যোক্তাকে উৎসাহ দিতে। তরুণ বয়সে এমন উদ্যোগ সত্যিই চমকে দেওয়ার মতো।’
খোর্শেদ আলম জানান, হলুদ তরমুজ শীত মৌসুমের ফসল। চাষের মাত্র তিন মাসের মধ্যেই ফলন পাওয়া যায়। চলতি মৌসুমে তার প্রায় তিন লাখ টাকা খরচ হয়েছে। ভালো ফলন হওয়ায় ৮ থেকে ৯ লাখ টাকা বিক্রির আশা করছেন তিনি।
গত মৌসুমেও প্রায় তিন লাখ টাকা ব্যয়ে তরমুজ চাষ করে প্রায় আট লাখ টাকার ফল বিক্রি করেছিলেন খোর্শেদ। এতে তিন মাসের ফসল থেকে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা আয় হয়।
খোর্শেদ বলেন, ‘জুড়ীর আবহাওয়া হলুদ তরমুজ চাষের জন্য খুবই উপযোগী। মাত্র তিন মাসে ফলন পাওয়া যায়। আমি মনে করি, এই এলাকায় আরও বড় পরিসরে চাষের সুযোগ রয়েছে।’
শুধু নিজের লাভ নয়, পতিত জমিকে কৃষিকাজে ব্যবহারের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান তৈরির সম্ভাবনাও দেখছেন এই উদ্যোক্তা। তার মতে, জুড়ী উপজেলায় এখনও বিভিন্ন কারণে হাজার হাজার বিঘা জমি পতিত পড়ে আছে। এসব জমি কাজে লাগানো গেলে কৃষি উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হবে।
জুড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদুল আলম বলেন, ল্যানফাই জাতের হলুদ তরমুজ চাষ ইতোমধ্যে এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। প্রতিদিন শত শত কৃষক ও দর্শনার্থী বাগানটি দেখতে আসছেন।
তিনি বলেন, ‘ল্যানফাই জাতের হলুদ তরমুজ একটি উচ্চমূল্যের উচ্চ ফলনশীল জাত। উৎপাদন পদ্ধতি অনেকটা দেশি তরমুজের মতো। এতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন এ ও সি রয়েছে এবং ফলটি বেশ মিষ্টি। জুড়ীর মাটি ও আবহাওয়া এ জাতের তরমুজ চাষের জন্য উপযোগী।’
কৃষি বিভাগের প্রশিক্ষণ ও মাঠপর্যায়ের সহযোগিতাকে এই সাফল্যের অন্যতম কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, তরুণ বেকাররা আগ্রহী হলে কৃষি অফিস থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ, প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতা দেওয়া হবে।
তুলি আক্তার/ অনলাইন ডেস্ক বিপিসি