দেশের বিদ্যমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে সরকার কীভাবে প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়ন করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। তিনি বলেন, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে ঘাটতি বাজেট দেওয়ার একটি সংস্কৃতি চালু রয়েছে, যা পূরণ করতে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নিতে হয়। ফলে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন দেখা দেয়।
সোমবার জাতীয় সংসদে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটের সম্পূরক মঞ্জুরি দাবির ওপর আনা ছাঁটাই প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
আলোচনায় রুমিন ফারহানা দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকের চিত্র তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশের জিডিপির আকার ৬৮ লাখ কোটি টাকা হলেও প্রবৃদ্ধির হার মাত্র ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৫ শতাংশে অবস্থান করছে। তিনি দাবি করেন, খেলাপি ঋণের পরিমাণ মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ, যার আর্থিক পরিমাণ প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতে মূলধন পর্যাপ্ততার হার ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে নেমে এসেছে।
তিনি আরও বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ২২ শতাংশ থেকে কমে ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে ২২ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা রপ্তানি হ্রাস এবং আমদানি বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।
সংসদে বক্তব্য দিতে গিয়ে রুমিন ফারহানা শ্বেতপত্রের তথ্যের উল্লেখ করে বলেন, গত ১৫ বছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। তার হিসাবে, প্রতি বছর গড়ে ১৪ থেকে ১৬ বিলিয়ন ডলার দেশ থেকে বেরিয়ে গেছে।
তিনি আরও দাবি করেন, Global Financial Integrity-এর তথ্য অনুযায়ী ওভার ও আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে প্রতিবছর প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে।
ব্যাংক খাতের সমালোচনা করে তিনি বলেন, গত ১৫ বছরে ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। প্রকৃত ব্যবসায়িক ভিত্তি না থাকা ব্যক্তিদের ঋণ দেওয়া হয়েছে, কিছু নির্দিষ্ট পরিবারের হাতে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়া হয়েছে এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সুদের হার ও ডলারের বিনিময় মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ডলারের ওপর চাপ কমাতে কৃত্রিমভাবে বিনিময় হার ধরে রাখার ফলে ১৮ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলার বিদেশে চলে গেছে বলেও তিনি দাবি করেন।
রুমিন ফারহানা বলেন, শেয়ারবাজার ও কর ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার না হলে অর্থনীতির চাপ আরও বেশি করে ব্যাংক খাতের ওপর পড়বে। অথচ খেলাপি ঋণের হার ইতোমধ্যে ৩৫ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। ফলে বেসরকারি খাতে নতুন বিনিয়োগের জন্য ব্যাংকগুলো পর্যাপ্ত ঋণ সরবরাহ করতে পারবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, International Monetary Fund সম্প্রতি জানিয়েছে, আগের ঋণ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশকে পরবর্তী কিস্তি দিতে হলে নতুন সরকারের সঙ্গে নতুন সমঝোতা প্রয়োজন হবে। ফলে ভবিষ্যতে ঋণের জন্য চীনসহ অন্যান্য দেশের দিকে তাকাতে হতে পারে।
বক্তব্যের শেষাংশে তিনি বলেন, Asian Development Bank, World Bank কিংবা আইএমএফের বাইরে অন্য উৎস থেকে ঋণ নিলে সাধারণত সুদের হার বেশি হয় এবং দ্রুত পরিশোধের বাধ্যবাধকতা থাকে। তাই বর্তমান অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে সরকার কীভাবে প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়ন করবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
Leave a Reply