কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে ঠাকুরগাঁও সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় গরু প্রবেশের অভিযোগ উঠেছে। জেলার বিভিন্ন সড়কে ঢাকামুখী ট্রাকে ভারতীয় গরু পরিবহনের দৃশ্য দেখা যাওয়ায় স্থানীয় খামারিদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, অবৈধভাবে আসা গরু বাজারে প্রবেশ করলে দেশীয় খামারিরা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়বেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বছরের মতো এবারও ঈদের প্রায় এক মাস আগে থেকেই ঠাকুরগাঁও থেকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বড় পশুর হাটে গরু পাঠানো শুরু হয়েছে। তবে গত কয়েকদিন ধরে ট্রাকগুলোতে ভারতীয় গরু পরিবহন করতে দেখা যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে পীরগঞ্জ ও বালিয়াডাঙ্গী সড়কের বিভিন্ন স্থানে এসব গরুবাহী ট্রাক চলাচল করতে দেখা গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে ৫টার পর ঠাকুরগাঁও থেকে বিভিন্ন জেলার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া ট্রাকগুলোতে ভারতীয় গরু পরিবহন করা হচ্ছে। মাঝরাত পর্যন্ত এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকে বলে দাবি স্থানীয়দের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সীমান্তবর্তী এক বাসিন্দা জানান, কয়েকটি চক্র ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ ও বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড বিজিবিকে ম্যানেজ করেই এই অবৈধ কার্যক্রম চালাচ্ছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গভীর রাতে সীমান্তঘেঁষা বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে গরু বাংলাদেশে প্রবেশ করানো হয়। পরে দ্রুত সেগুলো ট্রাকে তুলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বালিয়াডাঙ্গীর রত্নাই সীমান্ত, আমজানখোর ও ধনতলা ইউনিয়নসংলগ্ন এলাকা এবং রানীশংকৈলের ধর্মগড় ও জগদ্দল সীমান্ত দিয়ে গরু অনুপ্রবেশের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বালিয়াডাঙ্গী সীমান্ত এলাকার বাসিন্দা আশরাফুল ইসলাম বলেন, প্রায় প্রতিদিন গভীর রাতে সীমান্ত দিয়ে গরু ঢুকছে। একদিন রাত আড়াইটার দিকে কয়েকটি গরুর পাল সীমান্ত এলাকা দিয়ে ভেতরে আসতে দেখেছি। পরে সেগুলো ছোট ট্রাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।
আরেক প্রত্যক্ষদর্শী জাহিদ হাসান বলেন, লাহিড়ী হাটে ভারতীয় গরু বিক্রি হচ্ছে। গভীর রাতে বালিয়াডাঙ্গী সড়কে একের পর এক গরুবাহী ট্রাক চলাচল করতে দেখা যাচ্ছে। গরুগুলোর গঠন ও চিহ্ন দেখে সহজেই বোঝা যায় এগুলো ভারতীয়।
এদিকে ভারতীয় গরু প্রবেশের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় খামারিরা। ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার কালিতলা এলাকার খামারি মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, সারা বছর কষ্ট করে গরু পালন করার পর যদি বিদেশি গরু বাজার দখল করে নেয়, তাহলে দেশীয় গরুর দাম পড়ে যাবে। এতে ছোট ও মাঝারি খামারিরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক নাজমুল ইসলাম বলেন, এ বছর কোরবানির পশুর বাজার বেশ স্থিতিশীল ছিল। বিক্রেতা ও ক্রেতা উভয়েই দামে সন্তুষ্ট ছিলেন। কিন্তু ভারতীয় গরুর অনুপ্রবেশে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
ঠাকুরগাঁও জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. ইজাহার আহমেদ খান বলেন, সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে গরু প্রবেশ স্থানীয় অর্থনীতি ও খামারিদের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। বিশেষ করে কোরবানির ঈদের আগে এই চোরাচালান বাড়ে, যা দেশীয় গরুর ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তিতে বাধা সৃষ্টি করে।
এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও ৫০ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. তানজীর আহম্মদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রফিকুল হক বলেন, ভারতীয় গরু প্রবেশের বিষয়টি আগে তার জানা ছিল না। বিজিবি জানিয়েছিল সীমান্তে গরু পারাপার হচ্ছে না। তবে ভিডিও দেখে তিনি বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন। দ্রুত সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং বিজিবিকে সতর্ক থাকতে বলা হবে বলে জানান তিনি।
Leave a Reply