শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬, ০৮:০১ অপরাহ্ন

সীমান্তের হাটে ভারতীয় গরুর দাপট, বিপাকে হাওরের খামারি

অনলাইন ডেস্ক । বিপিসি বাংলা
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬
  • ২৩ বার

কোরবানির ঈদ সামনে রেখে সীমান্তবর্তী এলাকায় পশুর হাট ইজারা না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন প্রাণিসম্পদমন্ত্রী আমিন উর রশিদ। তবে সেই ঘোষণা কার্যকর হয়নি সুনামগঞ্জ জেলার সীমান্তঘেঁষা এলাকাগুলোতে। জেলার মধ্যনগর উপজেলার মহিষখলা গরুর হাট এবং দোয়ারাবাজারের ভোগলা গরুর হাটে এখনো চলছে ভারতীয় গরুর রমরমা বাণিজ্য। ফলে দেশীয় খামারি ও কৃষকেরা চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।

হাওরাঞ্চলের কৃষকেরা বলছেন, চলতি বছরের অতিবৃষ্টি ও ফসলহানিতে তারা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ধান তলিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি খড়ও পানিতে পচে গেছে। ফলে গবাদিপশুর খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে অনেক কৃষক কম দামে গরু বিক্রি করছেন। কিন্তু একই সময়ে সীমান্ত দিয়ে অবাধে ভারতীয় গরু ঢুকতে থাকায় দেশীয় গরুর দাম আরও কমে যাচ্ছে।

দেখার হাওরপারের ইসলামপুর গ্রামের কৃষক মাসুক মিয়া জানান, তাঁর ছয়টি গরুর মধ্যে একটি ৬০ হাজার টাকার গরু মাত্র ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে। বাকি গরুগুলোও বিক্রি করে দেওয়ার চিন্তা করছেন তিনি। কারণ খাদ্যের অভাবে গরু পালন কঠিন হয়ে পড়েছে। একই ধরনের অভিযোগ করেছেন কৃষক আব্দুল অদুদও। তাঁদের আশঙ্কা, ঈদ ঘনিয়ে এলে ভারতীয় গরুর প্রবেশ আরও বাড়বে এবং দেশীয় গরুর বাজার পুরোপুরি ভেঙে পড়বে।

গত ৩ মে সচিবালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রাণিসম্পদমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন, অবৈধভাবে পশু প্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তবর্তী এলাকায় কোনো পশুর হাট ইজারা দেওয়া হবে না। কিন্তু বাস্তবে সুনামগঞ্জে সেই নির্দেশনার কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। মধ্যনগর উপজেলার সীমান্তঘেঁষা মহিষখলা বাজারে প্রতি মঙ্গলবার নিয়মিত পশুর হাট বসছে এবং সেখানে ভারতীয় গরুর উপস্থিতিও স্পষ্ট।

জানা গেছে, মহিষখলা বাজারটি ইজারা দেওয়ার জন্য প্রশাসন পাঁচবার দরপত্র আহ্বান করলেও কোনো দরদাতা পাওয়া যায়নি। পরে বাংলা সালের ৩ বৈশাখ থেকে ১৪৩৩ সালের ৩০ চৈত্র পর্যন্ত খাস আদায়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ৬১ লাখ ৪০ হাজার টাকায় বাজারটির খাস কালেকশনের দায়িত্ব পেয়েছেন বংশীকুণ্ডা উত্তর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মো. মোক্তার হোসেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সীমান্তঘেঁষা হওয়ায় এই বাজারে সহজেই ভারতীয় গরু প্রবেশ করছে এবং সেগুলোকে বৈধতা দিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হচ্ছে। তাই কোরবানির ঈদ পর্যন্ত বাজারটি বন্ধ রাখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় খামারিরা। তবে ইজারাদার মোক্তার হোসেন দাবি করেছেন, এখানে প্রতি মঙ্গলবার নিয়মিত হাট বসে, আলাদা কোনো কোরবানির হাট নয়। সীমান্ত এলাকায় পশুর হাট বন্ধের সরকারি নির্দেশনার বিষয়েও তিনি অবগত নন বলে জানিয়েছেন।

এদিকে দোয়ারাবাজার উপজেলার বোগলা সীমান্ত এখন চোরাচালানের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর থেকেই সক্রিয় হয়ে ওঠে চোরাকারবারি চক্র। ভারতের মেঘালয় সীমান্তঘেঁষা পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকা ব্যবহার করে গরু বাংলাদেশে আনা হচ্ছে। পরে সেগুলো স্থানীয় খামারে কিছু সময় রেখে দেশীয় গবাদিপশু হিসেবে বাজারজাত করা হয়।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কিছু খামারি ও ইজারাদার এই কাজে জড়িত। প্রতিটি গরুর জন্য ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয় বলে জানা গেছে। দোয়ারাবাজার উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আবু হেনা মোস্তফা জানিয়েছেন, কিছু খামারে অস্থায়ীভাবে গরু রাখার অভিযোগ পাওয়া গেছে এবং তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অরুপ রতন সিংহ বলেন, ভোগলা বাজারে ভারতীয় গরু ঢোকার খবর পাওয়া গেছে এবং বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা সভায় আলোচনা হয়েছে। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তারিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অন্যদিকে সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সমর কুমার পাল বলেছেন, সীমান্তের কিছু হাট আগেই বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে। কোরবানির ঈদ সামনে রেখে এসব হাট নিয়ে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত এখনো পাওয়া যায়নি।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category