বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬, ০৫:০৫ পূর্বাহ্ন

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে স্থায়ী শেল্টার নির্মাণ জনমতের বিরুদ্ধে: প্রত্যাবাসন ত্বরান্বিত করতে কমিশন গঠনের দাবি

শাকুর মাহমুদ চৌধুরী, (উখিয়া) কক্সবাজার প্রতিনিধি
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬
  • ১৪ বার
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ইউএনএইচসিআর-এর মাধ্যমে স্থায়ী শেল্টার নির্মাণকে জনমতের বিরুদ্ধে উল্লেখ করে তা বন্ধের দাবি জানিয়েছেন কক্সবাজারের স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এনজিও নেতারা। একইসঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় কক্সবাজার সীমান্তে সেনাবাহিনী ও বিজিবির উপস্থিতি জোরদারসহ কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
রবিবার (১১ মে ২০২৬) কক্সবাজার সিএসও-এনজিও ফোরাম (সিসিএনএফ) আয়োজিত “কক্সবাজারে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে, রোহিঙ্গা ত্রাণ কার্যক্রমে স্থানীয় সরকার ও জনগণের অংশগ্রহণ জরুরি শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি উত্থাপন করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনা করেন সিসিএনএফ-এর কো-চেয়ার রেজাউল করিম চৌধুরী। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সীমান্তে কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ বন্ধে বিজিবির পাশাপাশি সেনাবাহিনীর শক্তিশালী উপস্থিতি জরুরি।
তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে আসিয়ান (ASEAN) ফোরামে কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখতে হবে এবং প্রয়োজনে আরাকান আর্মির সঙ্গেও আলোচনায় বসতে হবে। একইসঙ্গে কক্সবাজারের সংসদ সদস্যদের জাতীয় সংসদে রোহিঙ্গা সংকট ও সীমান্ত নিরাপত্তা বিষয়ক ইস্যু জোরালোভাবে উপস্থাপনের আহ্বান জানান তিনি।
বক্তারা অভিযোগ করেন, ইউএনএইচসিআরসহ জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা স্থানীয় এনজিওগুলোকে বাদ দিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন একশন এইড, টিডিএইচ ও এক্টেডকে প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব দিচ্ছে। অথচ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নিজস্ব দেশ থেকেই তহবিল সংগ্রহ করে কাজ করার কথা বলে দাবি করেন তারা।
সিসিএনএফ-এর সদস্য সচিব জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সম্প্রতি ইউএনএইচসিআর ব্র্যাক ও ইনফিনিক্সের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের জন্য স্থায়ী কাঠামোর ঘর নির্মাণ করছে, যা স্থানীয় সরকার বা রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই করা হচ্ছে। তিনি বলেন, এ ধরনের স্থায়ী অবকাঠামো স্থানীয় জনগণের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে। বিশ্বে কোথাও শরণার্থীদের জন্য স্থায়ী বসতি নির্মাণের নজির নেই।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, নির্মাণে ব্যবহৃত প্লাস্টিক ত্রিপলসহ বিভিন্ন উপকরণ পরিবেশবান্ধব নয় এবং এটি ভবিষ্যতে আরও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকে উৎসাহিত করতে পারে।
সিসিএনএফ সদস্য মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, জাতিসংঘের মানবিক সহায়তার বিপুল তহবিলের মাত্র ৮ শতাংশ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো পেলেও স্থানীয় এনজিওগুলোকে প্রত্যাশিত অংশ দেওয়া হচ্ছে না। তিনি স্থানীয় এনজিওদের জন্য সরাসরি বরাদ্দ নিশ্চিত করতে আইন প্রণয়নের দাবি জানান।
কোস্ট ফাউন্ডেশনের সহকারী পরিচালক মো. শাহিনুর ইসলাম বলেন, ব্র্যাকের মাধ্যমে পরিচালিত পুল ফান্ডে স্থানীয় এনজিওগুলো মাত্র ২২ শতাংশ সুবিধা পাচ্ছে, বাকি ৭৮ শতাংশ জাতীয় পর্যায়ের এনজিওগুলোর দখলে। তিনি স্থানীয় এনজিও কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে এই তহবিল বাস্তবায়নের দাবি জানান।
তিনি আরও বলেন, কক্সবাজারে কর্মরত বহু আন্তর্জাতিক এনজিও ও জাতিসংঘ সংস্থার শীর্ষ পদে একটি নির্দিষ্ট দেশের নাগরিকদের আধিপত্য রয়েছে, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। এসব গুরুত্বপূর্ণ পদে স্থানীয় ও বাংলাদেশি নাগরিকদের নিয়োগের আহ্বান জানান তিনি।
সিইএইচআরডিএফ-এর প্রধান নির্বাহী ও পরিবেশ আন্দোলনকর্মী মো. ইলিয়াস মিয়া বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্প স্থাপনের কারণে প্রায় ৮ হাজার একর বনভূমি ধ্বংস হয়েছে। এতে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। তিনি নাফ নদীর পানি পরিশোধনের মাধ্যমে সরবরাহ এবং পুকুর খননের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
কোস্ট ফাউন্ডেশনের সহকারী পরিচালক তানজির উদ্দিন রনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় সরকার ও জনপ্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমানে গঠিত রোহিঙ্গা কো-অর্ডিনেশন টিমে (RCT) স্থানীয় সরকারের কোনো প্রতিনিধি নেই। তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় কক্সবাজারবাসীর উদ্বেগ বাড়ছে। তাই জবাবদিহিমূলক একটি ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কমিশন’ গঠন জরুরি।
কম্বাইন হিউম্যান রাইটস ওয়ার্ল্ড-এর কেন্দ্রীয় বিশেষ প্রতিনিধি ইঞ্জিনিয়ার রবিউল হাসান বলেন, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (WFP) ভেন্ডরশিপ কার্যক্রমের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করা হচ্ছে, যা সঠিকভাবে তদারকি করা প্রয়োজন।
রাজাপালং ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ইঞ্জিনিয়ার হেলার উদ্দিন বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বর্জ্যে স্থানীয়দের প্রায় ৩০০ একর আবাদি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নামছে।
সংবাদ সম্মেলনের প্রশ্নোত্তর পর্বে রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে কোনো দৃশ্যমান রোডম্যাপ নেই। সীমান্তে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নেই, প্রতিনিয়ত নতুন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। তিনি দাবি করেন, ২০১৪ সাল থেকেই সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানানো হলেও এ বিষয়ে সরকারের কার্যকর জাতীয় নীতিমালা এখনও দৃশ্যমান নয়। পাশাপাশি ড. ইউনুসের উদ্যোগে জেনেভায় আয়োজিত রোহিঙ্গা বিষয়ক সম্মেলনের অগ্রগতি নিয়েও তিনি সংশয় প্রকাশ করেন।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category