বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম সীমান্তে আবারও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির (এএ) হঠাৎ গোলাগুলিতে সীমান্তঘেঁষা জনপদে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। কাঁটাতারের খুব কাছাকাছি অবস্থান নিয়ে পতাকা উড়িয়ে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে সংগঠনটি। তাদের মধ্যে নারী সদস্যদের উপস্থিতিও লক্ষ্য করা গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় এক মাস নীরব থাকার পর সোমবার (সন্ধ্যা) মাগরিবের নামাজের পর হঠাৎ করেই আধাঘণ্টাব্যাপী গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। মঙ্গলবার সকাল থেকে সীমান্তসংলগ্ন জলপাইতলী ও ঢেকুবুনিয়া ফকিরপাড়া ক্যাম্প এলাকায় আরাকান আর্মির সদস্যদের দৃশ্যমান উপস্থিতি বাড়তে দেখা যায়।
বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের পিলার ৩১ ও ৩২ সংলগ্ন এলাকা, বিশেষ করে জলপাইতলী অংশে আগে ফাঁকা থাকা আস্তানাগুলোতে এখন নিয়মিত অবস্থান করছে সশস্ত্র সদস্যরা। ক্যামেরায় ধরা পড়া দৃশ্যেও তাদের সক্রিয় উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে।
সীমান্তের পূর্বপাড়ার বাসিন্দা হামিদুল হক জানান,
সোমবার মাগরিবের পর হঠাৎ করে দুই দিক থেকে গুলির শব্দ শুরু হয়। এত কাছাকাছি থেকে গুলি হওয়ায় আমরা চরম আতঙ্কে পড়ি। এখন আবার তাদের অবস্থান চোখে পড়ছে, সদস্য সংখ্যাও বেড়েছে।
স্থানীয়দের ধারণা, কোনো পক্ষ তাদের অবস্থান শনাক্ত করায় তাৎক্ষণিকভাবে সতর্কতামূলক গুলি ছোড়া বা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটতে পারে। এতে করে পুরো সীমান্তজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
এলাকাবাসীর দাবি, তুমব্রু থেকে ঘুমধুম বিজিবি ক্যাম্প পর্যন্ত বিস্তীর্ণ সীমান্ত এলাকায় অন্তত দুই শতাধিক পরিবার এখন চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে। কৃষক, মৎস্যচাষি ও খামারিরা নিরাপত্তা শঙ্কায় খেত-খামার ও ঘেরে যেতে পারছেন না। গবাদিপশু চরানোও প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ৮৬ বছর বয়সী বাসিন্দা মোহাম্মদ আলম বলেন, হঠাৎ গুলির শব্দে মনে হচ্ছিল যুদ্ধ শুরু হয়েছে। ভয় পেয়ে ঘর ছেড়ে অন্যত্র চলে যাই। এমন পরিস্থিতি জীবনে খুব কম দেখেছি।
ইজিবাইক চালক রফিক (৩৯) বলেন, যাত্রী নিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ গুলির শব্দ শুরু হলে আমরা নিরাপদ আশ্রয়ে লুকাই। প্রায় এক ঘণ্টা পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে ফিরি। সীমান্তের একেবারে জিরো পয়েন্টের কাছাকাছি বসবাসকারী নুরুল আবছার জানান, কয়েকটি গুলি তাদের বাড়ির পাশেই এসে পড়ে। এতে পরিবার নিয়ে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে হয়। অন্যদিকে, তরুণ বাসিন্দা সায়মন (১৮) বলেন, প্রায় ১০০ রাউন্ড গুলির শব্দ শুনেছি। কী ঘটেছে বুঝতে না পারলেও ভয়টা খুব কাছ থেকে অনুভব করেছি।
নিরাপত্তা জোরদার, সতর্ক অবস্থানে বিজিবি
পরিস্থিতি মোকাবেলায় সীমান্তে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। বাড়ানো হয়েছে টহল, নজরদারি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
কক্সবাজারস্থ ৩৪ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস এম খায়রুল আলম বলেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে সংঘটিত এ ঘটনা তাদের নিজস্ব বিষয়। এটি বাংলাদেশের সীমানা থেকে প্রায় আড়াই কিলোমিটার ভেতরে ঘটেছে। সীমান্তে কোনো ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি নেই, তবুও আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছি।
তিনি আরও জানান, সীমান্ত সুরক্ষায় বিজিবি সবসময় সক্রিয় রয়েছে এবং যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুত। সীমান্তঘেঁষা এলাকাগুলোতে বারবার এ ধরনের গোলাগুলির ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের প্রভাব সীমান্তে পড়ে, তাই কূটনৈতিক পর্যায়ে সমন্বয় বাড়ানোর পাশাপাশি সীমান্ত নিরাপত্তা আরও জোরদার করা জরুরি।
এদিকে, ঘুমধুম সীমান্ত ঘেঁষে বসবাসরত দুই শতাধিক পরিবার এখনো আতঙ্ক কাটিয়ে উঠতে পারেনি। তাদের দাবি- স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক, যাতে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন সীমান্তবাসী।
Leave a Reply