গত বছরের ভয়াবহ বন্যার ক্ষত এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি ফেনীর উত্তরাঞ্চলের মানুষ। এরই মধ্যে সামনে এসেছে নতুন বর্ষা মৌসুম। কিন্তু মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর ভাঙা বাঁধ টেকসইভাবে সংস্কারের বদলে জোড়াতালির কাজ চলায় নতুন করে উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে স্থানীয়দের মাঝে। বিশেষ করে ফুলগাজী, পরশুরাম ও ছাগলনাইয়া উপজেলার নদীপাড়ের লাখো মানুষ আবারও বন্যার শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, গত বর্ষায় ভারতীয় উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টির কারণে মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর অন্তত ৩৫টি স্থানে বাঁধ ভেঙে যায়। এতে তিন উপজেলার ১০২টি গ্রাম প্লাবিত হয়। পানিবন্দি হয়ে পড়ে হাজারো পরিবার। ব্যাপক ক্ষতি হয় ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, মাছের ঘের ও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার।
বন্যার পর ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামতের জন্য প্রায় ২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয় বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। পরে বিভিন্ন স্থানে সংস্কার কাজ শুরু হলেও নয় মাস পার হওয়ার পরও অধিকাংশ এলাকায় স্থায়ী ও টেকসই কাজ সম্পন্ন হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কোথাও বালুভর্তি মাটির বস্তা ফেলে, কোথাও অস্থায়ীভাবে মাটি ভরাট করে দায়সারাভাবে বাঁধ মেরামতের কাজ চলছে। কয়েকটি স্থানে সদ্য সংস্কার করা অংশেও ফাটল দেখা দিয়েছে। এতে সামান্য ভারী বর্ষণ কিংবা উজানের ঢল নামলেই আবারও বাঁধ ভেঙে বন্যার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
ফুলগাজীর কৃষক আবদুল মোতালেব বলেন, গত বছরের বন্যায় তাদের সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি। অথচ এবারও টেকসই বাঁধ নির্মাণ না করে লোক দেখানো কাজ করা হচ্ছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই আতঙ্ক কাজ করে বলে জানান তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা কুলসুম আরা বেগম অভিযোগ করেন, প্রতি বছর বাঁধ সংস্কারের নামে কাজ হলেও পানি বাড়লে তা আবার ভেঙে যায়। ফলে স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় মানুষের দুর্ভোগ কমছে না।
পরশুরামের কলেজ শিক্ষার্থী এয়াকুব ইফাজ বলেন, বন্যার দুঃসহ স্মৃতি এখনো তাদের তাড়া করে ফেরে। বর্ষা মৌসুম এলেই পরিবার-পরিজন নিয়ে উৎকণ্ঠায় দিন কাটাতে হয়।
ফুলগাজীর নিলক্ষী গ্রামের বাসিন্দা তানজিদ শুভ বলেন, ভয়াবহ বন্যার দুই বছর পার হলেও এ অঞ্চলের মানুষ টেকসই বাঁধ নির্মাণে কার্যকর উদ্যোগ দেখেনি। ভারতের উজান থেকে আসা পানিতে প্রতি বছরই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হতে হচ্ছে স্থানীয়দের। তিনি স্থায়ী বাঁধ নির্মাণকে সময়ের দাবি বলে উল্লেখ করেন।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, চলমান প্রকল্পের আওতায় পর্যায়ক্রমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে কাজ করা হচ্ছে এবং বর্ষার আগেই গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর মেরামত শেষ করার চেষ্টা চলছে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের ভয়াবহ বন্যায় ফেনীর উত্তরাঞ্চলে হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়। বহু পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়। সেই দুঃসহ স্মৃতি এখনো তাড়া করে ফিরছে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের। বর্ষা সামনে রেখে নদীপাড়ের বাসিন্দাদের একটাই দাবি—প্রতি বছর ত্রাণ নয়, স্থায়ী সমাধান।
Leave a Reply