দেশে হঠাৎ বেড়েছে রডের দাম, নির্মাণ খাতের ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ
- আপডেট সময় : ১০:২৯:২৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬ ৩৬ বার পড়া হয়েছে
দেশের বাজারে হঠাৎ করে রডের দাম বেড়েছে। নির্মাণশিল্পের অন্যতম প্রধান কাঁচামালটির মূল্যবৃদ্ধির কারণে আবাসন ও অবকাঠামো খাতের ব্যবসায়ীরা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মূল্যবৃদ্ধি শুধু ব্যবসা নয়, সরকারের অবকাঠামোগত উন্নয়নার ধীরগতি ও ব্যয় বৃদ্ধির কারণ হতে পারে।
আবাসন ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করছেন, ইরানের যুদ্ধ ইস্যুকে সামনে এনে কিছু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে রডের দাম বাড়াচ্ছেন। সোমবার একদিনে রডের দাম টনপ্রতি প্রায় ১০ হাজার টাকা বেড়ে গেছে। তবে রি-রোলিং মিলের মালিকরা দাবি করছেন, বর্তমান বাজারে কোনো সিন্ডিকেটের সুযোগ নেই। যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহনে জাহাজ কোম্পানিগুলো বীমা দাবি না রাখায় ইস্পাত ও সিমেন্ট শিল্পের কাঁচামালের দাম ১৩০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে স্থানীয় বাজারেও প্রভাব পড়ছে এবং দাম বেড়েছে।
সরকারি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে সবচেয়ে বেশি সংকটে আছে জ্বালানি খাত। সেখানে জনস্বার্থের কথা চিন্তা করে দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়নি। কিন্তু কম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরও হঠাৎ রডের দাম বেড়ে যাওয়া ভালো ইঙ্গিত বহন করে না। তাছাড়া, বাজারে যে রড আছে, সেখানে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাব পড়ার কথা নয়। শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির জানিয়েছেন, তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন এবং জনস্বার্থ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কিছুদিন আগেও রডের দাম ছিল প্রতি টন ৭৫–৮০ হাজার টাকা। সোমবার তা টনপ্রতি ৯০–৯১ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। বাজারে প্রতি টন সিএসআরএম রডের দাম ৮৪ হাজার, আনোয়ার ইস্পাতের ৯০ হাজার, কেএসআরএম ও আকিজের মতো কোম্পানির রডের দাম ৯১ হাজার এবং রহিম স্টিলের রড ৮৭ হাজার টাকা বা তারও বেশি।
খাতসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে স্ক্র্যাপের দামও ঊর্ধ্বমুখী, যা স্থানীয় ইস্পাত শিল্পের উৎপাদন খরচ বাড়াচ্ছে। কয়লা, পেটকোক ও ক্লিংকারের দাম বৃদ্ধির কারণে সিমেন্টের উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। এছাড়া, ডলারের বৃদ্ধি আমদানিনির্ভর শিল্পগুলোর জন্য অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে। এসব মিলিয়ে নির্মাণসামগ্রীর কাঁচামালের ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, উৎপাদন খরচ বাড়ছে এবং শিল্পে সামগ্রিকভাবে ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, রডের মূল্যবৃদ্ধিতে স্থানীয় মিল-মালিকদের দায়ী করা হলেও আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। নির্মাণশিল্পে ত্রিমুখী চাপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে—জ্বালানি, আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহন ও কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি এবং স্থানীয় বাজারে মূল্য সমন্বয়ের মাধ্যমে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। এর ফলে আগামী দিনে বাংলাদেশের নির্মাণ ও অবকাঠামো খাতে ধীরগতি বা মন্দা দেখা দিতে পারে।
করোনাকালের সময়ে বিশ্বব্যাপী স্ক্র্যাপ সংকটের সময় বাংলাদেশে প্রিমিয়াম গ্রেডের রডের দাম টনপ্রতি সর্বোচ্চ ১ লাখ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। পরে বিশ্বজুড়ে মন্দা ও স্থানীয় বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় রডের দাম গত বছর ৭০–৮০ হাজার টাকায় নেমে আসে।
আবাসন খাতের শীর্ষ সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশনের (রিহ্যাব) সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট লিয়াকত আলী ভূঁইয়া বলেন, “এখন হঠাৎ করে রডের দাম বেড়ে গেছে। ইরান যুদ্ধের প্রভাব তো রড উৎপাদনে আরও পরে পড়ার কথা। এই মুহূর্তে অকারণে দাম বাড়ানো হয়েছে কিনা তা বোঝা যাচ্ছে না।” তিনি ব্রিক ওয়ার্কস লিমিটেডের চেয়ারম্যানও।
তিনি আরও বলেন, বাজার নিয়ন্ত্রণে নতুন সরকারকে মনিটরিং করার অনুরোধ করব। রিহ্যাব, এফবিসিসিআই ও রড ব্যবসায়ী সমিতিকে সঙ্গে নিয়ে বাজার মনিটরিং করা যেতে পারে। অন্যথায় আবাসন ব্যবসায় আবার দুর্দিন শুরু হতে পারে।
লিয়াকত আলী ভূঁইয়া বলেন, দেশের অর্থনীতিতে আবাসন খাত বড় ভূমিকা রাখে। এ খাতে ৪০ লাখ শ্রমিক সরাসরি কাজ করেন। লিংকেজ প্রতিষ্ঠানসহ মোট এক কোটির বেশি শ্রমিক এ খাতের সঙ্গে যুক্ত। হঠাৎ রডের দাম বেড়ে গেলে শ্রমিক ও মালিক উভয়ই ক্ষতির মুখে পড়বেন। তাই সরকারের নজরদারি জরুরি।
রডের দাম বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে রহিমা ইস্পাত লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. সাইফুর রহমান খোকন বলেন, “দেশের ইস্পাত শিল্প দীর্ঘদিন মন্দার মধ্যে রয়েছে। নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাজার কিছুটা ভালো হওয়ার আশায় ছিল। তবে সম্প্রতি ইরান যুদ্ধের কারণে বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য পরিবহনে অস্থিরতা বিরাজ করছে, বীমা কোম্পানি কোনো বীমা করতে রাজি হচ্ছে না। ফলে জাহাজ কোম্পানি অতিরিক্ত খরচ নিয়ে পণ্য পরিবহন করছে। কোনো পক্ষকে দোষারোপ করা ঠিক হবে না। বিষয়টি সরকারের নজরদারিতে থাকা দরকার। সাধারণ মানুষকে সঠিক তথ্য না দিলে ব্যবসায়ীদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি চলতে থাকে।”



















