এলপিজি খাতে নজিরবিহীন সঙ্কট, রমজানে বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা
- আপডেট সময় : ১১:৪১:৩৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬ ৫৬ বার পড়া হয়েছে
দেশের তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) খাত ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সঙ্কট, ইরান থেকে আসা এলপিজিবাহী জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং দেশে এলসি খোলার জটিলতা—সব মিলিয়ে আমদানি মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ায় বাজারে ভয়াবহ ঘাটতি তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় সরকার নির্ধারিত এক হাজার ৩০৬ টাকার ১২ কেজির সিলিন্ডার দুই হাজার থেকে দুই হাজার ৫০০ টাকাতেও মিলছে না। অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত দাম দিয়েও সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বাধ্য হয়ে বহু পরিবার আবার মাটির চুলা, কেরোসিন স্টোভ কিংবা বৈদ্যুতিক চুলায় ফিরে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ সতর্ক করে বলেছেন, রমজানে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে জানুয়ারি মাসে অন্তত দেড় লাখ টন এলপিজি আমদানি করে ফেব্রুয়ারির মধ্যেই তা বাজারে পৌঁছানো জরুরি। নির্ধারিত সময়ে এই আমদানি নিশ্চিত করা না গেলে রোজার মাসে বড় ধরনের সঙ্কট দেখা দিতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
বিইআরসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশে এলপিজি আমদানি হয়েছিল ১২ লাখ ৭৫ হাজার টন। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৬ লাখ ১০ হাজার টনে। তবে ২০২৫ সালে আমদানি কমে নেমে আসে ১৪ লাখ ৬৫ হাজার টনে, অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রায় দেড় লাখ টন এলপিজি কম আমদানি হয়েছে। বিশেষ করে বছরের শেষ তিন মাসে আমদানির পতন সবচেয়ে বেশি হওয়ায় বাজারে সরাসরি সঙ্কট তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেখানে দেশে এলপিজির চাহিদা প্রতি বছর ১০ শতাংশের বেশি হারে বাড়ছে, সেখানে আমদানি কমে যাওয়ায় পুরো বাজার কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। বিইআরসির হিসাবে, লাইসেন্সধারী ৫২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২৩টির আমদানির সক্ষমতা থাকলেও গত বছর নিয়মিত আমদানি করেছে মাত্র ৮টি প্রতিষ্ঠান। বড় কয়েকটি কোম্পানি এলসি জটিলতার কারণে আমদানি বন্ধ রাখায় সঙ্কট আরও তীব্র হয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, সঙ্কটের মূল কারণ দুটি—ব্যাংকিং খাতে এলসি খোলার জটিলতা এবং ইরান থেকে আসা এলপিজিবাহী জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা। চট্টগ্রামের একাধিক আমদানিকারক জানিয়েছেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যাংকিং খাতে অনিশ্চয়তার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান সময়মতো এলসি খুলতে পারেনি। এর ফলে আমদানি চেইনে বড় ধরনের ছেদ তৈরি হয়েছে।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক ও এলপিজি ব্যবসায়ী মাহফুজুল হক বলেন, বাংলাদেশের এলপিজির বড় উৎস মধ্যপ্রাচ্য। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে কয়েকটি জাহাজ আটকে যাওয়ায় বাংলাদেশমুখী সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। তিনি জানান, আগে ইরান থেকে একটি বেসরকারি চ্যানেলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ এলপিজি আসত, সেটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাজারে হঠাৎ করে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
এদিকে ভোক্তা পর্যায়ে দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও বরিশালে দিনের পর দিন সিলিন্ডার মিলছে না। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা তামান্না আক্তার জানান, এক হাজার ৩০৬ টাকার সিলিন্ডার কিনতে তাকে গুনতে হয়েছে দুই হাজার ৩০০ টাকা। মিরপুরের রূপনগরের আরাফাতুল ইসলাম ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনেছেন দুই হাজার ৭০০ টাকায়। রাজধানীর অনেক পরিবার গ্যাস না পেয়ে নতুন করে কেরোসিন স্টোভ কিনছে বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্যবসায়ীদের দাবি, বর্তমানে বাজারে প্রায় ৭০ শতাংশ সিলিন্ডার খালি পড়ে আছে। যেটুকু সরবরাহ আসছে, তা ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। সরবরাহ সংকটে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে হোটেল-রেস্তোরাঁ ও মেসগুলো।
সঙ্কটের প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতেও। দেশে প্রতি মাসে গড়ে এক লাখ ৪০ হাজার টন এলপিজি ব্যবহৃত হয়, যার প্রায় ১৫ হাজার টন যায় অটোগ্যাসে। কিন্তু সরবরাহ না থাকায় দেশের প্রায় সব অটোগ্যাস স্টেশন বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন ও কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। এতে প্রায় দেড় লাখ এলপিজিচালিত যানবাহনের মালিক চরম বিপাকে পড়েছেন।
সংগঠনের সভাপতি সেরাজুল মাওলা বলেন, মোট ব্যবহারের অন্তত ১০ শতাংশ এলপিজি অটোগ্যাস খাতে নিশ্চিত না করলে পুরো খাত ধসে পড়বে। তখন চালকরা আবার পেট্রোল ও অকটেনে ফিরে যেতে বাধ্য হবেন, যা পরিবেশ ও জ্বালানি ভারসাম্যের জন্য ক্ষতিকর।
কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম শফিকুজ্জামান প্রশ্ন তুলেছেন, সরকার নির্ধারিত দাম যেখানে এক হাজার ৩০০ টাকা, সেখানে ভোক্তা কেন আড়াই হাজার টাকা দেবে। তিনি এলপিজিকে অত্যাবশ্যক পণ্য ঘোষণা, শক্ত নজরদারি এবং স্বচ্ছ মূল্যকাঠামো নিশ্চিতের দাবি জানান।
বিইআরসি অবশ্য স্বীকার করেছে, খুচরা পর্যায়ে দাম নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়েছে। কমিশনের সদস্য মিজানুর রহমান বলেন, শীতকালে চাহিদা বাড়ে, জাহাজ সঙ্কটও রয়েছে। তবে এসব সমস্যা সাময়িক দাবি করে তিনি জানান, ইতোমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত ও নজরদারি অভিযান শুরু হয়েছে।
তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। বাজারে কয়েকটি বড় কোম্পানির আধিপত্যের কারণে ছোট অপারেটররা টিকতে পারছে না। জেএমআই চেয়ারম্যান আবদুর রাজ্জাক সতর্ক করে বলেন, ২৭ অপারেটরের মধ্যে মাত্র পাঁচটির প্রকৃত আমদানির সক্ষমতা রয়েছে। এই ভারসাম্যহীনতা অব্যাহত থাকলে পুরো বাজার আরও অস্থির হয়ে উঠবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সঙ্কট কেবল আমদানির নয়, নীতিগত সমন্বয়হীনতারও ফল। অধ্যাপক এম তামিম বলেন, এলপিজি খাতে একটি একক ও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ কাঠামো প্রয়োজন। বর্তমানে লাইসেন্স, আমদানি অনুমোদন ও মূল্য নির্ধারণে বহুমুখী সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া থাকায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
সরকারি পর্যায় থেকে জানানো হয়েছে, এলসি খোলায় অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে এবং আমদানি অনুমতির পরিধি বাড়ানো হয়েছে। জ্বালানি উপদেষ্টা ফৌজুল কবির খান জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) ভিত্তিতে এলপিজি আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে বেসরকারি খাতের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ কমানো যায়।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশে এলপিজির বার্ষিক চাহিদা এখন প্রায় ২০ লাখ টন, যা অদূর ভবিষ্যতে সাড়ে ৩৫ লাখ টনে পৌঁছাতে পারে। দ্রুত বর্ধনশীল এই বাজারে পরিকল্পনাহীনতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, বর্তমান সঙ্কট তারই বড় উদাহরণ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রমজান সামনে রেখে অন্তত দেড় লাখ টন জরুরি আমদানি নিশ্চিত না করা গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। ভোক্তা পর্যায়ে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, এলসি প্রক্রিয়া সহজীকরণ, জাহাজ সঙ্কটে বিকল্প রুট খোঁজা এবং অটোগ্যাস খাতে ন্যূনতম বরাদ্দ নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ। নইলে এলপিজি খাতের এই অস্থিরতা শুধু রান্নাঘর নয়, পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তাকে বড় ঝুঁকিতে ফেলবে—যার চূড়ান্ত মাশুল দিতে হবে সাধারণ মানুষকেই।



















