সরকারের কাজ নিয়ে মতপ্রকাশ করতে পারে না প্রায় ৭৩% মানুষ
- আপডেট সময় : ১২:১৮:৪৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ ৬৭ বার পড়া হয়েছে
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক জরিপে উঠে এসেছে, দেশের ৭৮ শতাংশ মানুষ মনে করেন রাজনীতিতে তাদের কোনো প্রভাব নেই। একই সঙ্গে ৭৫ শতাংশ মানুষের ধারণা, সরকারের নীতি সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া অন্তর্ভুক্তিমূলক নয়। এ ছাড়া ৭৩ শতাংশ মানুষ বিশ্বাস করেন, সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে নিজেদের মতামত প্রকাশের স্বাধীনতাও তারা পান না।
বিবিএস পরিচালিত ‘নাগরিক ধারণা’ জরিপের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। বুধবার (২৪ ডিসেম্বর) আনুষ্ঠানিকভাবে জরিপের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এর আগে গত জুন মাসে জরিপের প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল বিবিএস। জরিপের তথ্য সংগ্রহ করা হয় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে।
নাগরিকদের অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে নিরাপত্তা, সুশাসন, সরকারি সেবার মান, দুর্নীতি, ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার এবং বৈষম্য—এই ছয়টি সূচকে অগ্রগতি মূল্যায়নের লক্ষ্যে জরিপটি পরিচালনা করা হয়। এসব সূচক টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ১৬তম লক্ষ্যের অংশ। জরিপে দেশের ৬৪ জেলার ৪৫ হাজার ৮৮৮টি খানার ১৮ বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সী মোট ৮৪ হাজার ৮০৭ জন নারী-পুরুষ অংশ নেন।
দুর্নীতি বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জরিপের এক বছর আগে সরকারি সেবা পেতে ঘুষ দেওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ৩১ দশমিক ৬৭ শতাংশ মানুষ। সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে উঠে এসেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নাম। নাগরিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, প্রায় ৮৫ শতাংশ মানুষ সন্ধ্যার পর নিজ বাসার আশপাশের এলাকায় একা চলাফেরা করতে নিরাপদ বোধ করেন। তবে বাকি ১৫ শতাংশ মানুষ এ সময় নিজেকে অনিরাপদ মনে করেন।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পরিসংখ্যান ভবনে আয়োজিত জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব আলেয়া আক্তার। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার এবং পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মাসুদ রানা চৌধুরী। বিবিএসের মহাপরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের সভাপতিত্বে জরিপের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন প্রকল্প পরিচালক রাশেদ-ই-মাসতাহাব। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন বিবিএসের এসডিজি সেলের ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা উপপরিচালক মো. আলমগীর হোসেন।
প্রতিবেদনে রাজনীতি ও সরকারের কর্মকাণ্ডে নাগরিকদের প্রভাবের বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে এসেছে। মাত্র ২১ দশমিক ৯৯ শতাংশ মানুষ মনে করেন, তারা রাজনীতিতে কোনো না কোনোভাবে প্রভাব রাখতে পারছেন। বিপরীতে ৭৮ শতাংশ মানুষই মনে করেন, তাদের কোনো প্রভাব নেই। গ্রাম ও শহরের মধ্যে এ ক্ষেত্রে তেমন কোনো পার্থক্য দেখা যায়নি। তবে লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রাজনীতিতে প্রভাব রাখতে পারছেন বলে বিশ্বাস করেন এমন মানুষের মধ্যে পুরুষের হার ২৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ, আর নারীর হার ১৭ দশমিক ৮১ শতাংশ।
সরকারের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে মতামত প্রকাশ করতে পারেন বলে মনে করেন ২৭ দশমিক ২৪ শতাংশ মানুষ। বাকি ৭২ দশমিক ৭৬ শতাংশ মানুষ মনে করেন, তারা মতপ্রকাশের সুযোগ পান না। এখানেও গ্রাম ও শহরের মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য নেই। অন্যদিকে, মাত্র ২৪ দশমিক ৬২ শতাংশ মানুষ মনে করেন, সরকারের নীতি সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সেখানে তাদের মতামত বিবেচনায় নেওয়া হয়। অধিকাংশ মানুষ এ ধারণা পোষণ করেন না, এবং এ ক্ষেত্রেও নারী-পুরুষ কিংবা গ্রাম-শহরের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ফারাক নেই।
জরিপ অনুযায়ী, সরকারি সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে বিআরটিএ। ৬৩ দশমিক ২৯ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, বিআরটিএর সেবা নিতে ঘুষ দিতে হয়। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, যেখানে ৬১ দশমিক ৯৪ শতাংশ মানুষ ঘুষ দেওয়ার অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। তৃতীয় স্থানে রয়েছে পাসপোর্ট অফিস, যা ৫৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ অংশগ্রহণকারীর মতে দুর্নীতিগ্রস্ত। এ ছাড়া ভূমি নিবন্ধন অফিসে ঘুষ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন ৫৪ দশমিক ৯২ শতাংশ, বিচারপতি, ম্যাজিস্ট্রেট ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের ঘুষ দেওয়ার অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন ৫৩ দশমিক ৭৭ শতাংশ এবং ভূমি জরিপ অফিসে ঘুষ দেওয়ার কথা বলেছেন ৫১ দশমিক ৪০ শতাংশ মানুষ। ঘুষের লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রায় সবাই—৯৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ মানুষ—টাকার মাধ্যমে ঘুষ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
অনুষ্ঠানে বক্তারা এই চিত্রকে জাতীয় উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন। পরিকল্পনা বিভাগের সচিব বলেন, ঘুষ ও দুর্নীতি নিয়ে এই জরিপ সমাজের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে। অনেক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী বেতন ও সুযোগ-সুবিধা নিলেও দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন না—এ বিষয়ে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়েও অসন্তোষ রয়েছে। তিনি জানান, জনগণ নিরবচ্ছিন্নভাবে সরকারি সেবা পাচ্ছে কি না, তা তদারকিতে একটি মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তবে নানা বাধার কারণে তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। অনেকেই জবাবদিহিতার আওতায় আসতে চান না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিবিএসের মহাপরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, জরিপের ফলাফলে একাধিক সূচকে উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে। মানুষ মতপ্রকাশ করতে ভয় পায়, সেবা পেতে ঘুষ দিতে হয় এবং চিকিৎসাসেবায় ভালো ব্যবহার না পাওয়ায় বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। এসব বিষয়ই দেশের জন্য বড় ধরনের জাতীয় উদ্বেগের কারণ বলে মন্তব্য করেন তিনি।



















