হাদিকে ‘গিনিপিগ’ মন্তব্য করায় তীব্র বিতর্কের মুখে নিলুফার চৌধুরী মনি
- আপডেট সময় : ১১:৫১:১৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ৫৯ বার পড়া হয়েছে
আততায়ীর গুলিতে নিহত ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে ‘গিনিপিগ’ বলে মন্তব্য করে তীব্র বিতর্কের মুখে পড়েছেন বিএনপির স্বনির্ভরবিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য নিলুফার চৌধুরী মনি। তাঁর এই বক্তব্যকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে ব্যাপক সমালোচনা। শহীদ ওসমান হাদিকে নিয়ে এমন মন্তব্যের জন্য মনির কাছে জাতির কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়েছেন অনেকে।
মঙ্গলবার (২৩ ডিসেম্বর) রাতে আব্দুন নূর তুষারের সঞ্চালনায় চ্যানেল নাইনের বিশেষ আয়োজন ‘চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়’ শীর্ষক ‘নাইন সংলাপে’ অংশ নিয়ে নিলুফার চৌধুরী মনি বলেন, ‘হাদিকে আমার কাছে এই মুহূর্তে একটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ গিনিপিগ ছাড়া আর কিছুই মনে হয় নাই। আপনারা যারা ডাক্তার, এখানে অনেকে আছেন, আপনারা তেলাপোকা কাটতেন, সেলাই-টেলাই করে ছেড়ে দিতেন—চলত। বাট হাদি হয়তো চলতে পারে নাই।’ তাঁর এই বক্তব্য অনুষ্ঠানে উপস্থিত আলোচকদের মধ্যেই অস্বস্তি সৃষ্টি করে।
এ সময় সঞ্চালক আব্দুন নূর তুষার হাদিকে নিয়ে কোনো আপত্তিকর বক্তব্য না দিতে আলোচকদের অনুরোধ জানান। পরে তিনি মনির বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে প্রশ্ন করেন, ওসমান হাদিকে ব্যবহার করে কেউ উদ্দেশ্য হাসিলের চেষ্টা করেছে কি না। জবাবে মনি বলেন, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই। এটা তো বলার কোনো অপেক্ষাই রাখে না। হাদির দলের কয়টা লোক ছিল বা আছে বলেন? আমি তাঁকে ছোট করে বলছি না, তাঁর দলটাকে বলছি। এত মানুষ, সমস্ত দেশ থেকে আনা হলো বা এলো—এর মধ্যে বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন আছে। এই প্রশ্নবোধক চিহ্নটা নির্বাচনকে বানচাল করার চেষ্টা করছে।’
অনুষ্ঠানেই মনির বক্তব্যের প্রতিবাদ জানান জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট হুমায়রা নূর। তিনি বলেন, ওসমান হাদি কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন না এবং ইনকিলাব মঞ্চ নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলও ছিল না। তাঁর ভাষায়, ‘হাদির যুদ্ধটা ছিল সমাজের দুর্নীতি, অপতৎপরতা ও গণতন্ত্রবিরোধী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে। উনি স্পষ্টবাদী ছিলেন, কবি কাজী নজরুলের ভক্ত ছিলেন। উনি বড়লোক ছিলেন না, টাকাও বিলাতেন না। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর বস্তিবাসী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে হাহাকার দেখেছি, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।’
হুমায়রা নূর আরও বলেন, হাদির জানাজার উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা কষ্টদায়ক। তাঁর দাবি, জানাজায় যারা এসেছিলেন, সবাই এসেছিলেন একজন মানুষ—ওসমান হাদির জন্য, কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থনে নয়। ‘তারা জানত, আর কখনো তাঁকে দেখতে পারবে না, তারপরও শেষবারের মতো দোয়া করতে এসেছে,’ বলেন তিনি।
এই বক্তব্য প্রচারের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিলুফার চৌধুরী মনির বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় ওঠে। এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব জয়নাল আবেদিন শিশির ফেসবুকে লিখেছেন, ‘একজন মৃত হাদিকে নিয়েও এত ভয়, এত মিথ্যাচার! শহীদের সঙ্গে এই ধৃষ্টতা আমরা সহ্য করব না।’ তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, এর আগেও মনি শহীদ আবরার ফাহাদকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন।
ইউনাইটেড পিপলস বাংলাদেশ (আপ বাংলাদেশ)-এর আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদ মনির বক্তব্যকে দায়িত্বজ্ঞানহীন আখ্যা দিয়ে লিখেছেন, শহীদ ওসমান হাদিকে ‘গিনিপিগ’ বলা এবং জানাজার জনসমাগমকে তুচ্ছ করা অনভিপ্রেত। তাঁর মতে, এই মন্তব্যের ব্যাখ্যা বিএনপির পক্ষ থেকে আসা উচিত এবং নিলুফার চৌধুরী মনির দ্রুত বক্তব্য প্রত্যাহার করে ক্ষমা চাওয়া প্রয়োজন।
একই সুরে আপ-বাংলাদেশের চিফ কো-অর্ডিনেটর রাফে সালমান রিফাত ও অন্যান্য নেটিজেনরাও মনির বক্তব্যের কড়া নিন্দা জানিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, শহীদদের মর্যাদা নিয়ে বারবার বিতর্কিত মন্তব্য করে তিনি রাজনৈতিক শালীনতার সীমা লঙ্ঘন করেছেন।
এদিকে ‘নাইন সংলাপে’ নিলুফার চৌধুরী মনি ছাড়াও অংশ নেন এনডিএমের চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ, জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ডা. জাহেদ উর রহমান এবং সিপিবি কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ডা. সাজেদুল হক রুবেল। তবে আলোচনার মূল বিষয় ছাপিয়ে শেষ পর্যন্ত মনির ‘গিনিপিগ’ মন্তব্যই জনআলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে।



















